সত্যজিৎ রায় । চলচ্চিত্র নির্মাতা । সম্পাদক

0

কোনো চলচ্চিত্র নির্মাতা তার প্রথম চলচ্চিত্র দিয়েই ১১ টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছেন; এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই আছে। কিন্তু সেই নজিরবিহীন কাজটিই করে দেখিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়; তার ‘পথের পাঁচালি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। পথের পাঁচালিই সত্যজিতকে এনে দেয় কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘শ্রেষ্ঠ মানব দলিল পুরস্কার-বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্টারি এ্যাওয়ার্ড’।
শুধু পথের পাঁচালিই নয় নির্মাতা হিসেবে সত্যজিৎ যেমন ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী; তার সৃষ্টি সম্ভারও ছিলো বিপুল। বর্নাঢ্য জীবনে নির্মান করেছেন ৩৭ টি পূর্ণদৈর্ঘ কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ চলচ্চিত্র। পথের পাঁচালি, অপরাজিত ও অপুর সংসার এই তিনটি চলচ্চিত্রকে একসঙ্গে বলা হয় অপু ত্রয়ী। এবং এই চলচ্চিত্র-ত্রয়ী তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ বা ম্যাগনাম ওপাস হিসেবে বহুল স্বীকৃত।


বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী সত্যজিৎ রায় শুধু চলচ্চিত্র নির্মানই করেননি; চিত্রনাট্য রচনা, চরিত্রায়ন, সঙ্গীত স্বরলিপি রচনা, চিত্র গ্রহণ, শিল্প নির্দেশনা, সম্পাদনা, শিল্পী-কুশলীদের নামের তালিকা ও প্রচারণাপত্র নকশা করাসহ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট প্রায় সবরকম কাজেই পারদর্শী ছিলেন তিনি। চলচ্চিত্র নির্মানের বাইরেও সত্যজিৎ ছিলেন একাধারে কল্পকাহিনী লেখক, প্রকাশক, চিত্রকর, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক।
আর, সত্যজিৎ রায়ের অনবদ্য সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র ‘ফেলুদা’র কথা তো সবারই জানা। ফেলুদার চরিত্রে প্রদোষচন্দ্র মিত্র, ফেলুদা’র প্রধান সহকারি তার খুড়তুতো ভাই তপেশ চন্দ্র মিত্র ওরফে তপশে এবং জটায়ু নামধারী লেখক লালমোহন গাঙ্গুলির নাম আজো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ফেলুদা’র গোয়েন্দা কাহিনী নিয়ে হয়েছে অনেক উপন্যাস আর চলচ্চিত্র।
কি চলচ্চিত্র আর কি উপন্যাস সবক্ষেত্রে সুনাম কুড়ানো সত্যজিৎ রায় ভারতীয় নাগরিক হলেও তার পৈত্রিক ভিটা কিশোরগঞ্জে; কটিয়াদি উপজেলার মসুয়া গ্রামে। জন্মেছেন ভারতের কলকাতায় ১৯২১ সালে। সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন ১৯ শতকের বাংলার ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন ‘ব্রাহ্ম সমাজের’ অন্যতম নেতা। ছিলেন লেখক, চিত্রকর, দার্শনিক, প্রকাশক ও শখের জোতির্বিদ। সত্যজিত রায়ের পিতা সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সেরা শিশু সাহিত্যিকদের একজন। এসব দিক বিশ্লেষণ করে একথা বলাই যায়, চলচ্চিত্র আর সাহিত্যজ্ঞান সেতো সত্যজিতের রক্তেই ছিলো।
পড়ালেখা করেছেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। একজন বানিজ্যিক চিত্রকর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা সত্যজিৎ রায় যে একসময় এতো বড় মাপের চলচ্চিত্রকার এবং সাহিত্যিক হয়ে উঠবেন একথা হয়তো অনেকেরই কল্পনারও অতীত ছিলো। বর্ণময় জীবনে পেয়েছেন বহু পুরস্কার। ১৯৯২ সালে হৃদযন্ত্রের জটিলতা নিয়ে অসুস্থ সত্যজিৎ ভর্তি হন হাসপাতালে। এরপর সে অবস্থা থেকে তার স্বাস্থ্য আর ভালো হয়নি। মৃত্যুর কিছু সপ্তাহ আগে অত্যন্ত অসুস্থ ও শয্যাশায়ী অবস্থায় গ্রহন করেন তার জীবনের শেষ পুরস্কার সম্মানসূচক অস্কার। তার কিছুদিন পরই ওই বছরের ২৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন সত্যজিৎ। অবসান ঘটে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ একজন চলচ্চিত্রকারের বর্নাঢ্য জীবনের। তিনি চলে গেছেন ঠিকই; কিন্তু গোটা বিশ্বের কোটি কোটি চলচ্চিত্রপ্রেমীর কাছে আজো এক উজ্জ্বল নক্ষত্র সত্যজিৎ।

জানালেন : আরিফুল ইসলাম ( দেশ টিভি )

Comment

comments

Comments are closed.