রং এবং তার ব্যবহার

0

রং কে এক সময় মনে করা হত বস্তুকে চিহ্নিত করবার উপকরণ-বস্তুই একটি দৃশ্যমান উপাদান যার সাহায্যে আমরা রংকে নির্ণয় করে থাকি। চিত্রকর্মে বহুদিন পর্যন্ত রং-এর স্বতন্ত্র সত্তা অপরিজ্ঞাত ছিলো। রং যে নিজস্ব আভায় একটি অস্তিত্ব বা সুনিশ্চয়তা সে সম্পর্কে এখনও সকলের ধারণা সুপরিস্ফুট নয়। চিত্রকর্মের ইতিহাসে দীর্ঘকাল পর্যন্ত রং- কে অলঙ্ককরণের উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাঁর ক্রিটিক অব জাজমেন্ট গ্রুপে রং সম্পর্কে প্রচলিত বিশ্বাসের কথাই বলেছেন চিত্রকর্মে, ভাস্কর্যে, ¯’পত্যে এবং উদ্যান-সজ্জায় গঠন-কৌশল এবং আকৃতিই সব কিছু। ……. রং ……. এর সাহায্যে এর ঔজ্জ্বল্য পায় কিন্তু রং আকৃতির সৌন্দর্যময়তার একটি অংশ মাত্র। আধুনিককালে চিত্রকর্মে রংকেই আকৃতির মূলধার বলা হচ্ছে অর্থাৎ রং অলঙ্করণ নয়, রংই অস্বিত্বের মূলে।

রং-এর বিভাগ বৈচিত্র্য সীমাহীন-কত প্রকার সম্ভাব্য মিশ্রণ এবং দীপ্তিগত প্রকাশ যে এর আছে তা সংক্ষিপ্ত গণনায় নির্ণয় করা যায় না। সুতরাং একজন শিল্পীর রং ব্যবহারের প্রচুর সুযোগ থাকে এবং চিত্তের সকল প্রকার ইঙ্গিত ও আশ্বাসকে রং-এর সাহায্যে তিনি প্রকাশ করতে পারেন। রং একটি অসাধারণ প্রকাশক্ষম শিল্প উপাদান এবং প্রকাশ-ক্ষমতার প্রাচুর্যেও কারণেই এর প্রয়োগবিধি জটিল এবং অনবরত পরিবর্তনশীল। কোন দৃষ্টিতে একজন শিল্পী রং-কে দেখেন এবং অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার আয়ত্তে আনেন তা নির্ণয় করা খুবই কঠিন। শিল্পী সত্তাতার উপলব্ধির একান্ত নির্জনতায় সত্যকে যেভাবে আবিস্কার করেন তারই দৃশ্যগত রূপন্তর ঘটে চিত্রকর্মে অকুন্ঠ বর্ণবিভার সাহায্যে। রং-এর অপব্যয়ে নয় কন্তিু নিগুঢ়তম পরীক্ষায় সূক্ষèতিসুক্ষè ব্যঞ্জনায়তার একটি যথার্থ প্রয়োগবিধি অনেকে আবিস্কার করবার চেষ্টা করেছেন কন্তিু বিধিপ্রকরণের মধ্যে তাকে কখনও আবদ্ধ রাখা সম্ভবপর হয়নি। প্রতিবারই নতুন আবিস্কারের মধ্যেই রংএর নির্মাল্য। প্রত্যেক শিল্পীই তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অন্তসার থেকে রংএর স্বভাবকে আবিস্কার করেন এবং নিজস্ব প্রয়োগ পদ্ধতি সুষ্পষ্ট করেন।

নিউটন পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন, যদিও সূর্যালোক দৃশ্যত বর্ণ-বিভাগহীন, কন্তিু মূলত তা সাতটি বর্ণা রস্মির সম্মিলন-নীল লোহিত বা বেগুনী, গাঢ়নীলাভ, নীল, সবুজ, হলুদ, কমলা এবং লাল। যে বস্তুতে সব কটি রং-এর প্রতিক্ষেপ ঘটে-তা সাদা দেখায়, আবার যে-বস্তু সব কটি একসঙ্গে শোষণ করে তা কালো দেখায়। শোষণের ফলে আলোর অভাব ঘটে, তাই কালো হচ্ছে সম্পূর্ণ অন্ধকার।

আলোর রষ্মি প্রতিবিন্বিত হলেই বস্তুতে রং পরিস্ফূট হয়। আমরা রং তখনই দেখি যখন বস্তুতে এক বা একাধিক আলোক-রষ্মি প্রতিবিন্বিত হয় এবং অবশিষ্ট রষ্মি গুলো শোষিত হয়। যে-রষ্মি গুলো শোষিত হয় সেগুলো সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় এবং আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পরে না। যে আলোক-রষ্মি বস্তুতে আপতিত হয়ে শোষিত হচ্ছে না অথবা বস্তুর মধ্য দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারছে না তার প্রতিক্ষেপ ঘটবে অর্থাৎ বস্তু সে-রষ্মিকে বিক্ষিপ্ত করবে। যে কৌণিকরূপে রষ্মি বস্তুর উপর নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, বস্তুর একই কৌণিক পরিমাপে তাকে বিক্ষেপ করবে। কোন বস্তুর বহির্দেশ যদি অসমতল থাকে তবে তা নিস্তেজ বা অনুজ্জ্বল দেখাবে তার কারণ আপতিত আলো তীক্ষèভাবে প্রতিবিম্বিত না হয়ে যততত্র ছড়িয়ে পড়ে অর্থাৎ তা বহুকৌণিকতায় বিভক্ত হয়ে তীক্ষè তাহারিয়ে ফেলে। অন্যপক্ষে সুমসৃণ বস্তুর উপর নিক্ষিপ্ত আলোর বর্ণাঢ্যতা অসাধারণ উজ্জ্বল।

স্বচ্ছ বস্তুর মধ্য দিয়ে গমনকালে সূর্যকিরণের গতি বিবর্তিত হয়, কিন্তু যে-বস্তু আংশিকভাবে স্বচ্ছ কিছুর ষ্মিতারমধ্যে শোষিত হয় এবং কিছু রষ্মি বিক্ষিপ্ত হয়। কোনও ঘন কঠিন বস্তুই পুরোপুরি স্বচ্ছ নয় অথবা পুরোপুরি অস্বচ্ছও নয়। সকল বস্তুতেই আলোর কিছুটা শোষণ এবং কিছুটা প্রতিবিক্ষণ ঘটে। তাছাড়া বাতাস কখনই পুরোপুরি পরিস্কার নয়। তাই বাতাস ভেদ করে যে-সূর্যকিরণ নামে তার স্পর্শে বস্তুপুঞ্জ বিচিত্র আকৃতি ধারণ করে। তাই প্রায় সকল বস্তুর উপরেই রং-এর লীলা-বৈচিত্র্য ঘটে।

আলোর মধ্যেই যতো রং-এর খেলা। তাই আলোর পরিবর্তনের সঙ্গে রং-এর পরিবর্তন ঘটে। তাছাড়া একটি বস্তুকে এদিক-ওদিক নাড়লে রং ও নড়াচড়া করে। এভাবে রং-এর পরিবর্তনের সঙ্গে বস্তুর আকৃতিরও পরিবর্তন ঘটে।

অনেক শিল্পী দৃষ্টিতে রং-এর যে বৈচিত্র্য ধরাপরে তার বিজ্ঞানগত বিশ্লেষণ করে তা প্রয়োগ করেছেন কন্তিু এ-রকম শিল্পী খুব কম। শিল্প একটি মানসপ্রক্রিয়া-বিজ্ঞানের বিচারকে শিল্প অস্বীকার করে না কন্তিু হৃদয়ের অভিপ্রায়কে সে মান্য করে। রং-এর বিমিশ্রণ কে শিল্পীর জানতে হয় এবং এভাবে প্রয়োগতজ্ঞানের সাহায্যে শিল্পী রং-এর তাৎপর্যকে প্রকাশ করেন। আলোর স্বাভাবিক আবহকে ব্যাখ্যা করবার জন্য বিভিন্নরূপে-এর বিমিশ্রণ ঘটাতে হয়। রং-এর বিভাজন-জনিত সিদ্ধান্তকে নিম্নরূপে উপস্থতি করা যায়:

হলুদ, লাল এবং নীল এ-তিনটি রং অবিমিশ্র মৌলিক। এগুলোকে প্রাইমারী রং বলা হয়। অন্যান্য রং এ-তিনটি রং-এর বিভিন্ন সংমিশ্রণে সৃষ্টি। আবার মৌলিক রং তিনটি যে- কোনও দুটির মিশ্রণে সেকেন্ডারী রং-এর সৃষ্টি হয়। সেকেন্ডারী বা দ্বৈত পর্যায়ের রং হচ্ছে কমলা (হলুদ+লাল); বেগুনী (লাল+নীল), সবুজ (নীল+হলুদ)। মিশ্রণের ঘনত্বের তারতম্যে এবং দুটি রং-এর পারস্পরিক অনুপাতের তারতম্যে সেকেন্ডারী রং-এর বিচিত্র বিভাজন ঘটানো যায়। যেমন সবুজ রংটি নীলের কাছাকাছি হতে পারে, আবার হয়তো হলুদের কাছাকাছি আসতে পারে। খাঁটি সবুজ নীল-হলুদের মাঝামাঝি।

for color

উপরের বৃত্তে যে কটি রং চিহ্নিত করা হয়েছে ঘনত্ব ও ঔজ্জ্বলের তারতম্যের ক্রম অনুসারে তার প্রত্যেকটিকে আবার ছ’ভাগে ভাগ করা যায়। এর ফলে মোট বাহাত্তুরটা রং পাওয়া যাবে। এভাবে অগ্রসর হয়ে আরও রং নির্ণয় করা যায়। উপরের বৃত্তে একটি রং-এর অবিকল বিপরীতে যে-রংটি আছে তার পরস্পর একে অন্যের অনুপূরক। লাল হচ্ছে সবুজের অনুপূরক। লাল-বেগুনী, হলুদ-সবুজের, বেগুনী হচ্ছে হলুদের ইত্যাদি। আলো যেমন অন্ধকারের বিপরীতে ধরা পরে অথবা উষ্ণতা শীতলতার, তেমনি অনুপুরক রং একে অন্যের বিরোধাভাসে ধরা পরে। কিন্তু দুটো অনুপূরক রং একে অন্যের সঙ্গে মিশ্রিত হলে তারা একে অন্যকে নিশ্চিহ্ন করে ধূসর বা কালো হয়ে যায়। তিনটি মৌলিক রং-এর যে- কোনও দুটির মিশ্রণে যে রংটি তৈরী হবে, তা হবে তৃতীয় রংটির অনুপূরক যেমন হলুদ ও নীলের সংমিশ্রনের তৈরী সবুজ হচ্ছে লাল রং-এর অনুপুরক। ইমপ্রেশনিষ্ট বা সংবেদনগ্রস্থ শিল্পীর মৌলিক বা প্রাথমিক রং-এ আঁকা কোনও বস্তুর ছায়াকে অনুপূরক রং-এ চিত্রিত করতেন।

শেজাঁ প্রথম প্রমাণ করলেন, দৃষ্টিতে বিভিন্ন রং-এর আনুপাতিক অপসৃয়মানতা আছে, অর্থাৎ একই সমতলে থাকলেও কোনও রং মনে হয় সামনে এগিয়ে আসছে এবং কোন রং পিছিয়ে যাচ্ছে। লাল রং-এর একটি স্বতঃসম্মুখবর্তিতা আছে। ক্যানভাসের যেখানেই এ রং-এর সংস্থাপন ঘটুকনা কেন মনে হবে অন্য সব রংকে ব্যবহার করা যায়। তাছাড়া আমাদের দৃষ্টিগত অনুভূতিতে রং-এর অপসৃয়মানতার যে স্বভাব ধরা পড়ছে তার সাহায্যে শিল্পীরা বস্তুর ঘনত্ব এবং পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

মতিস রং সম্পর্কে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, রং-এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে চিত্রের প্রকাশময়তা কে যতটা সম্ভব সফল করা। প্যারিসে‘ ফভবাদ এসেছিলো প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড়ের মতো, স্বস্পকালীন বিক্ষুব্বতা শিল্প-জগৎ কে চিহ্নিত করেছিলো, অবিমিশ্র রং-এর প্রগলতায় ক্যানভাসকে আপ্লুত করেছিলো কিš‘ ফভবাদীদের মধ্যে বেঁচে রইলেন একমাত্র মাতিসতাঁর প্রকাশময়তার জন্য। আলোর অভিব্যঞ্জনা থেকে চিত্রকে মুক্ত করে, তথাকথিত বস্তুগত বর্ণসাক্ষ্য থেকে চিত্রকে অভিব্যক্তির বিভায় প্রকাশময় করে মাতিস জীবনকে নতুন ভাবে সম্ভাষণ করলেন। রং-এর ক্ষেত্রেই এ কথাটা সত্যি। চিত্র হচ্ছে ঐক্যতানের মতো। যেখানে রংই প্রধান সেখানে রং-এর সাহ্যয্যেই ফর্ম উদ্ভাসিত হচ্ছে এবং পরিসরের বন্ধন-সীমায় পরিপ্রেক্ষিত এবং গভীরতার ইঙ্গিতময়তা সৃষ্টি হচ্ছে।

(সৈয়দ আলী আহসান এর বই থেকে সংগৃহীত)

 

 

Comment

comments

Comments are closed.